ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৪ উপলক্ষে বিভিন্ন পর্যায়ে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার(৭অক্টোবর) সন্ধায় চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট মৎস বনিক সমবায় সমিতির কক্ষে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
চাঁদপুর জেলা মৎস কর্মকর্তা মোঃ গোলাম মেহেদী হাসানের সঞ্চালনায়-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন বলেন- আপনার বলেন জেলেরা কার টাকায় জাল কিনে, কার টাকায় নৌকা কিনে। জেলেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যাবসায়ীরা।একজন জেলের সামর্থ নেই, সে জাল ক্রয় করে নদীতে গিয়ে মাছ ধরবে। আপনারা ব্যাবসায়ীরাই তাদের পিছনে ইনভেস্টমেন্ট করেন।
আপনারা সবাই বলেন প্রসাশনকে সহযোগিতা করেন, সবাই যদি প্রশাসনকে সহযোগিতা করেন, তাহলে মাছ ধরেন কারা। ইলিশ জাতীয় সম্পদ। ইলিশের নার্সিং করা লাগবে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এটাই আপনারা চান। তবে,জেলা মৎস বিভাগের ব্যার্থতা রয়েছে অনেক।
তিনি বলেন, আমি আপনাদের কাছ থেকে লিখিত আইডিয়া চাই প্রকৃত সমাধানের জন্য। বাংলাদেশের যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে, তারমধ্যে চাঁদপুর অন্যতম। কিন্তু আজকে আপনাদের নদী বন্দর হারিয়ে গেছে।
তিনি আরো বলেন, ইলিশের প্যাকেটজাত করণ নিয়ে ব্যাবসায়ীদের বলেন, ইলিশ প্যাকেটজাত করার সময় তেমন কোনো ভালো মানের প্যাকেজিং হয়না। অর্থাৎ মানসম্মত প্যাকেটজাত করা হয়না। এতেও ইলিশের বাজারজাতকরণ কমে গেছে।
এসময় তিনি বলেন, চলেন আমরা সবাই মিলে বদলে যাই। নদী থেকে জেলেরা মাছ ধরে আনার পর বিক্রি করে ব্যাবসায়ীর কাছে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই জেলে গরীবই রয়ে যাচ্ছে। মূল কাজ করেন জেলারা কিন্তু লাভবান হচ্ছেন ব্যাবসায়ীরা। তিনি ব্যাবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, জেলেরা আপনাদের ব্যাবসায়ীদের কে যে এগারো মাস সময় দেন, সে জেলেদেরকে ২২দিন সময় ও সেবা দেন আপনারা।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে কোনো নৌকাতে ইঞ্জিন থাকতে পারবেনা।মোট ১৬হাজার ইঞ্জিন চালিত নৌকা রয়েছে, এগুলো জমা দিয়ে দেন। নয়তো সব ইঞ্জিন পুড়িয়ে দেওয়া হবে। আমরা ভূল করেছি, অন্যায় করেছি, এখন সচেতন হতে হবে। আমাদের সবাইকে এই সময়টা মানতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন ১৩তারিখ থেকে কোনো হোটেলেও ইলিশ থাকতে পারবেনা।
এসময় তিনি বলেন, যারা চরাঞ্চলে বালু ব্যাবসা করে, ইলিশের মহোৎসব করেন তাদেরকে ধরা হবে। এবং জেলার কোথাও কোনো ড্রেজার থাকবেনা। সকল ড্রেজার জব্দ করা হবে।
বরফ কল নিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে কোনো বরফ কল চালু থাকবেনা। সকল বরফ কল বন্ধ রাখতে হবে। আমি সকল জেলেদের জন্য হেলথ ক্যাম্প করে দিচ্ছি আপনারা আমাকে লিখিত দিয়ে সহায়তা করেন। এই ২২দিন অসুস্থ্য জেলেদের চিকিৎসা করা হবে।
আইনানুযায়ী প্রকৃত মৎস্যজীবী ছাড়া কোনো লোক কমিটিতে কোনো থাকার নিয়ম নেই। তাহলে কেন থাকছেন। আমরা চাইনা এই ২২দিন কোনো জেলে নদীতে নামুক। আপনারা সহায়তা করবেন। কোনো চেয়ারম্যান, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর ফোনের তরপদারি করিনা।
ইলিশে জিরো ইনভেস্টমেন্ট থাকা সত্ত্বেও কেন এতো দরদাম। জেলেদের অনেক শ্রম আছে। তারা মাঝ নদী থেকে কষ্ট করে ধরেন। কিছু মৌসুমী ব্যাবসায়ীরা ইলিশ নষ্ট করছেন। আপনারা সচেতন হোন।
এসময় উপস্থিত অন্যান্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন- সদর উপজেলা মৎস বনিক সমিতির সভাপতি- মানিক,চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি- শাহাদাৎ হোসেন শান্ত, লালপুর মৎস আড়ৎদার হান্নান কবিরাজ, চাঁদপুর সদর আনন্দ বাজার মৎস সমিতির মালেক। এসময় উপস্থিত মৎস সমিতির ব্যাবসায়ী ও বক্তারা বলেন, মা ইলিশ রক্ষার জন্য সকলের এগিয়ে আসা উচিত। যাদের দেশ প্রেম নাই, দেশের প্রতি ভালোবাসা নেই তারাই মা ইলিশ ঝরতে মরিয়া হয়ে পড়েন।
তারা আরো বলেন, বঙ্গোপসাগরের বর্ডারে ইলিশ প্রজনন মৌসুমে অভিযান অব্যহত রাখা, চাঁদপুর জেলার প্রত্যেকটি মাছঘাটে সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা, মুস্টিময় কিছু অসাধু জেলে রয়েছেন, এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়াসহ সকল আইনি ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়াও প্রকৃত জেলেদেরকে ভাতা কার্ড করে দিলে তারা নদীতে যাবেনা। অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী রয়েছেন, যাদের নামে বেনামে জেলে কার্ড রয়েছে, এগুলো খুঁজে বের করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তারা জানান। তারা বলেন, আমরা অভিযানের পক্ষে আছি, আমরাও সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করবো।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন -চাঁদপুর জেলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোস্তাফিজুর রহমান,চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার- মুহম্মদ আব্দুর রকিব (পিপিএম), চাঁদপুর জেলা নৌ পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান।
এছাড়াও সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন- চাঁদপুর সদর উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা-মো মিজানুর রহমান, চাঁদপুর জেলা কোস্টগার্ড, মৎস বনিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক-শবেবরাত, চাঁদপুর মৎস বনিক সমিতির সকল নেতৃবৃন্দসহ অন্যান্য ব্যাবসায়ী এবং ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।