চাঁদপুর জেলার সবকটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বিস্কুট, কেক, পাউরুটি, মিষ্টি ও বিভিন্ন মুখরোচক খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী অসংখ্য বেকারি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই পরিচালিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াই। ফলে প্রতিনিয়ত জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অনেক বেকারির নেই বিএসটিআইর অনুমোদন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর নিবন্ধন কিংবা ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। অথচ প্রতিদিন এসব কারখানায় বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে জেলার বিভিন্ন বাজার, মুদি দোকান, চায়ের স্টল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠয়ের সামনে ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা হচ্ছে।
বেকারিগুলোর ভেতরের পরিবেশ আরও উদ্বেগজনক। দেখা যায়, অধিকাংশ শ্রমিকের হাতেই নেই গ্লাভস বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী। খালি হাতে আটা-ময়দা মাখানো হচ্ছে। অনেককে খালি গায়ে ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে খামির তৈরি করতে দেখা যায়। কোথাও একজন কর্মী এক হাতে সিগারেট টানছেন, অন্য হাতে খাদ্যপণ্য তৈরি করছেন। উৎপাদন কক্ষের ভেতরে খোলা তেলের ড্রাম, পোড়া তেল, ঘি, ভাতের মাড়, বর্জ্য পানি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক রঙ একসঙ্গে রাখা হয়েছে। এসব স্থানে মাছির উপদ্রবও চোখে পড়ার মতো। উৎপাদিত বিস্কুট, কেক ও পাউরুটি সংরক্ষণের স্থানও অনেক ক্ষেত্রে স্যাঁতসেঁতে, দুর্গন্ধযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের কাঁচামাল, অনুমোদনহীন খাদ্য রঙ, নিম্নমানের ভোজ্য তেল এবং ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কিংবা প্রস্তুতকারকের পূর্ণাঙ্গ তথ্যও সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে আরও জানা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে আগত একাধিক ব্যবসায়ী দোকান ভাড়া নিয়ে দলবদ্ধভাবে বেকারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অধিক ভাড়া দিয়ে দোকান নিয়ে ৬ থেকে ১০ জন মিলে যৌথভাবে এসব কারখানা পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে চাঁদপুরের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম বলে অনেকেই দাবি করেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এছাড়া, একাধিক বেকারিতে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের দিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব শিশুকে ভারী বস্তা বহন, খামির তৈরি, ওভেনে পণ্য ঢোকানো ও প্যাকেটজাত করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। শ্রম আইন অনুযায়ী শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাঝে মধ্যে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করলেও অভিযানের পর আবারও আগের মতোই কার্যক্রম শুরু হয় ফলে জরিমানার স্থায়ী কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু জরিমানা নয়, অবৈধ ও অননুমোদিত বেকারির বিরুদ্ধে নিয়মিত যৌথ অভিযান, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স যাচাই, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং পুনরায় আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, শ্রম অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।