রোববার (২৫ আগস্ট) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা লাহারকান্দি এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।
জানা যায়, নোয়াখালীর বন্যার পানি লক্ষ্মীপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে শনিবারের তুলনায় আজ এক থেকে দেড় ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উঁচু অনেক জায়গায় নতুনভাবে প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয়ের খোঁজে অনেকে ভিটেমাটি ছেড়ে লক্ষ্মীপুর শহর এলাকায় আত্মীয়-স্বজন কিংবা ভাড়া বাসায় ছুটছেন।
গেল দুদিন বৃষ্টিপাত না হলেও গত শনিবার (২৪ আগস্ট) রাতভর মাঝারি বৃষ্টিপাতের ফলে পানির উচ্চতা বেড়েছে। এর ফলে সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন থেকে তাদের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় ঘরে থাকা এখন দায় হয়ে পড়েছে। তার ওপরে রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্নাও করতে পারছেন না তারা। এতে না খেয়েই তাদের জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
জানা যায়, টানা ভারিবর্ষণে লক্ষ্মীপুরের সর্বত্র জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। এরমধ্যে পানি কমতেও শুরু করেছিল জেলা শহরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতে। কিন্তু শুক্রবার থেকে নোয়াখালীর বন্যার পানি রহমতখালী খাল, ওয়াপদা খাল ও ভুলুয়া নদী দিয়ে লক্ষ্মীপুরে ঢুকে পড়ায় বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে লক্ষ্মীপুর পৌরসভা ও পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ এলাকার মানুষ নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পানিবন্দি এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুদিন ধরে নোয়াখালীর বন্যার পানি রহমতখালী খাল হয়ে লক্ষ্মীপুরে ঢুকে পড়েছে। এতে সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের চন্দ্রগঞ্জ, চরশাহী, দিঘলী, মান্দারী, বাঙ্গাখাঁ, উত্তর জয়পুর ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রায় ৫-৬ ফুট পানিতে ডুবে আছে জনপদ।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা-হাজীগঞ্জ বেড়ির পশ্চিম পাশে ভুলুয়া নদী বৃষ্টির পানিতে টইটুম্বুর হয়ে গেছে। প্রায় ২৬ দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে জনপদ। রামগতি-কমলনগর ও নোয়াখালীর আন্ডারচর ও চরমটুয়া গ্রামের ৩ লক্ষাধিক মানুষ এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ভারিবর্ষণ ও জোয়ারের কারণে এখন পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৫৫ ম্যাট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বন্যার্তদের জন্য জেলার ১৮৬টি স্থায়ী এবং ৬০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। সবাইকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নোয়াখালীর পানির চাপে চন্দ্রগঞ্জ, চরশাহী, দিঘলী, হাজীরপাড়া, লাহারকান্দি, মান্দারী, কুশাখালী, পার্বতীনগর তেওয়ারীগঞ্জসহ কয়েকটি ইউনিয়নে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব এলাকায় ভারিবর্ষণের পানি সঙ্গে যোগ হচ্ছে নোয়াখালী থেকে আসা পানি। অনেক এলাকায় কোমর সমান পানি রয়েছে। ঘর-বাড়ির ভিতরেও পানি। লক্ষ্মীপুর সদরের রহমতখালী খাল, রামগতি, কমলনগরের ভুলুয়া নদী, রামগঞ্জের ওয়াপদা, বিরেন্দ্র খাল, রায়পুরের ডাকাতিয়া নদীসহ বিভিন্নস্থানে নদী-খাল দখল করে মাছ চাষ, সেতু-কালভার্ট-রাস্তা, দোকানপাটসহ স্থাপনা নির্মাণ করার কারণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
চরশাহী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম রাজু বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের পাশেই নোয়াখালী। এতে সেখানকার পানির চাপ আমার এলাকায় এসেছে। ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাটে এখন ৩-৪ ফুট পানি। এতে সাইক্লোন সেল্টারসহ ১৬টি স্থানে কিছু লোক আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের সরকারি-বেসরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে।’
লক্ষ্মীপুরের বন্যার সার্বিক বিষয় নিয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ইউনুস মিয়া বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলে পানি বেড়েছে। নোয়াখালীর বন্যার পানি বেগমগঞ্জ হয়ে এসব এলাকায় ঢুকে পড়েছে। ভাটার সময় স্লুইস গেট দিয়ে পানি বের হচ্ছে। আশাকরি পানি নামতে থাকলে পরিস্থিতি উন্নতি হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘বন্যার্তদের জন্য জেলার ১৮৬টি স্থায়ী এবং ৬০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে রোববার পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।’
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, ‘জেলার পাঁচ উপজেলার প্রায় ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গত মানুষদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’