চাঁদপুরে মেঘনা নদীর ভাঙন রোধে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালের মধ্যে এই বাঁধ নির্মাণ কাজ শতভাগ সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুর সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেঘনার ভাঙন রোধ এবং চাঁদপুর শহর সংরক্ষণের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তবে অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০২৪ সালের শুরুতে শহর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য ৮১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
৩ দশমিক ২২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই বাঁধ নির্মাণ কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা দাবি করেছেন, কোনো ধরনের দুর্নীতি ছাড়াই যেন প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।
চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনা সংলগ্ন বড় স্টেশন, মোলহেড, পুরান বাজার বাণিজ্যিক এলাকা থেকে হরিসভা পর্যন্ত অংশ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এবং পানি কমে গেলে এসব এলাকায় বাঁধে ভাঙন ও ফাটল দেখা দেয়।
হরিসভা এলাকার বাসিন্দা সীতা রানী (৬৮) জানান, তিনি এই এলাকায় তিন থেকে চারবার মেঘনার ভাঙন প্রত্যক্ষ করেছেন। ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে বর্তমানে রাস্তার পাশে ছিন্নমূল হিসেবে বসবাস করছেন। তিনি আশা করেন, বাঁধ নির্মাণে যেন কোনো ধরনের দুর্নীতি না হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মর্জিনা বেগম (৫০) বলেন, বর্ষা এলেই ভাঙনের আতঙ্ক শুরু হয়। অনেক সময় রাতে ভাঙনের ভয়েই ঘুমাতে পারেন না তারা। বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হলে এলাকার মানুষের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুরান বাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান (৪৮) জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে এই এলাকায় মেঘনার ভাঙন চলছে। আগে কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে তাদের বসতি ছিল। এখন সঠিকভাবে বাঁধ নির্মাণ হলে আবার বসবাসের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
ভাঙনের শিকার হয়ে অনেক পরিবার ছিন্নমূল হয়ে পড়েছে। ভুলু ঋষি (৭০) বলেন, ভাঙনে সব হারিয়ে তিনি এখন সড়কের পাশে বসবাস করছেন। প্রয়োজনে বাঁধ নির্মাণের স্বার্থে অন্যত্র সরে যেতে রাজি থাকলেও ছিন্নমূলদের জন্য সরকারের আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
শহর সংরক্ষণ প্রকল্পে মোট ১৯টি প্যাকেজে কাজ চলছে। জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ডাম্পিং শেষে বর্তমানে ব্লক ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। ব্লক তৈরিতে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো বিদেশ থেকে আনা অটোমেটিক মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসকে এমদাদুল হক আল মামুনের সহকারী প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সুদীপ্ত গুন জানান, অটোমেটিক মেশিনে তৈরি ব্লকগুলো আরও নিখুঁত এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মানদণ্ড পূরণ করছে। এই কাজের তত্ত্বাবধান করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক বলেন, ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। জিও ব্যাগ ডাম্পিং শেষ করে বর্তমানে ব্লক ডাম্পিং চলছে এবং প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, বাঁধের ওপর বসবাসকারী কিছু ছিন্নমূল পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।