শিরোনাম
সরকারের আর্থিক সংস্কার ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতায় সন্তুষ্ট আইএমএফ: অর্থমন্ত্রী ছাত্রশিবিরের দায়িত্ব ছাড়লেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল, সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বৃহস্পতিবার থেকে বাড়তে পারে বৃষ্টির প্রবণতা বন্যা পরিস্থিতিতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জাতীয় ছাত্রশক্তির সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জরুরি নির্দেশনা শাহরাস্তিতে চলাচলের রাস্তায় কাঁটা তারের বেড়া: ১৭টি পরিবার গৃহবন্দি, মানবেতর জীবন যাপন ‘বীর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এলপিজির দাম বড় পরিমাণে কমলো, ১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৫২৮ টাকা নজরুল কেবল অতীত নন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও প্রেরণা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা রেল সেতুর পিলারের নিচে মাটি কাটা প্রকল্পেরই অংশ: সড়ক ও রেলমন্ত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের ফ্লাইট থেকে ১৯ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার, মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা হাবিপ্রবিতে হল সংঘর্ষের ঘটনায় ৬ শিক্ষার্থী আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি আরও ৬০ জনের অনলাইন জুয়া দমনে নতুন আইন, কার্যকর ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে কাটল আইনি জটিলতা
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন

কোরবানি : ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর সান্নিধ্যের উৎসব

খোরশেদ আহমেদ, সম্পাদক / ১৮১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৬ জুন, ২০২৫

“আজহা” শব্দের অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ, আর “ঈদ” শব্দটি এসেছে ‘উৎসব’ অর্থে। তাই ঈদুল আজহার শাব্দিক অর্থ—ত্যাগের উৎসব। আরবি “উজহিয়্যা” শব্দ দ্বারা বোঝানো হয় সেই পশুকে, যা কোরবানির দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবাই করা হয়। “কোরবান” শব্দটি এসেছে আরবি “কুরব” ধাতু থেকে, যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য ও উৎসর্গ। কোরআনেও এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

ইতিহাসের প্রথম কোরবানি ছিল আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের। আল্লাহ বলেন, “তুমি তাদের আদমের দুই পুত্রের বাস্তব ঘটনা শুনিয়ে দাও। তারা কোরবানি করেছিল। তাদের একজনের কোরবানি কবুল হয় এবং অপরজনেরটি কবুল হয়নি” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ২৭)। এখানে ‘কোরবান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যেটি উর্দু ও ফার্সিতেও প্রচলিত।

আরবি ভাষায় কোরবানির জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ রয়েছে, যেমন নুসুক, যার অর্থ ত্যাগ ও উৎসর্গ। কোরআনে এসেছে, “বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু—সব কিছুই আল্লাহর জন্য” (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২)। অন্যদিকে, নাহার শব্দটির অর্থও উৎসর্গ বা জবাই করা, যেমন বলা হয়েছে, “তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো” (সুরা কাওসার, আয়াত: ২)। কোরবানির দিনে তাই বলা হয় ইয়াওমুন নাহার—অর্থাৎ উৎসর্গের দিন। তবে নাম যাই হোক, উজহিয়্যা, কোরবানি, নুসুক বা নাহার—সবার মূলার্থ এক: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ।

আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এবং তিনি আমাদের সবচেয়ে প্রিয়—এটাই বান্দার ঈমানের দাবি। তাই তাঁর সন্তুষ্টির জন্য আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করাই কোরবানির মূল দর্শন। এই পরীক্ষা তিনি নিয়েছেন তাঁর প্রিয় বন্ধু নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে।

ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদেশ পান প্রিয় সন্তান ইসমাইলকে জবাই করার জন্য। তিনদিন একই স্বপ্ন দেখার পর পুত্রকে বলেন, “হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে জবাই করছি। তোমার কী মত?” ইসমাইল (আ.) জবাব দেন, “হে আমার পিতা, আপনি যা আদেশ পেয়েছেন তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন” (সুরা সফফাত, আয়াত: ১০২)।

দুই নবী—পিতা ও পুত্রের এই আত্মসমর্পণ আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। ইব্রাহিম (আ.) যখন ছুরি চালাতে উদ্যত, তখন আল্লাহ বলেন, “তুমি তো তোমার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছো। এভাবেই আমি সৎকর্মীদের পুরস্কৃত করি। নিশ্চয়ই এটি ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে পরিবর্তে দিলাম এক মহান জন্তু” (সুরা সফফাত, আয়াত: ১০৫-১০৭)।

ইসলামে কেবল মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং সব যুগেই কোরবানির বিধান ছিল। আল্লাহ বলেন, “আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানির বিধান দিয়েছি, যেন তারা আল্লাহর নামে জীবজন্তু জবাই করে” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৪)। তবে ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানি থেকেই আমাদের বর্তমান প্রথার সূচনা। কোরবানির মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ বলেন, “তাদের গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)।

কোরবানি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং একটি গভীর আত্মিক অনুশীলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ আমাদের সমাজে লৌকিকতা, লোকদেখানো ও প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে কোরবানি। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, “তাকওয়া এখানে”—বলেই তিনি তিনবার তাঁর বুকে ইশারা করেছেন (মুসলিম)। কোরবানি হতে হবে নিঃস্বার্থ, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। নয়তো তা কেবল মাংস বিতরণের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

কোরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিকও রয়েছে। এতে গরিব-দুঃখী ও মুখ ফুটে কিছু চাইতে না পারা আত্মীয়-প্রতিবেশীরাও সমানভাবে উপকৃত হন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা তা থেকে আহার করো এবং আহার করাও দরিদ্র, মুখ চাওয়া অসহায়দেরকে” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬)। তাই কোরবানির মাংস তিন ভাগে বিভক্ত—নিজের জন্য, আত্মীয়-প্রতিবেশীদের জন্য, এবং গরিব-দুঃখীদের জন্য।

এই মাংস বিতরণের মাধ্যমে সমাজে দয়া, সহানুভূতি ও সাম্যবোধের বাস্তব অনুশীলন হয়। এমন সময় দরিদ্র মানুষও অতিথি হিসেবে মর্যাদা পায়, যা অন্য কোনো ইবাদতের মাধ্যমে এভাবে সম্ভব নয়।

প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, যদি তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে—অর্থাৎ দৈনন্দিন প্রয়োজন ছাড়াও অতিরিক্ত সম্পদ যা রুপার হিসেবে প্রায় ৬৫-৮০ হাজার টাকা। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে এই ইবাদত আদায় করতে হয়।

পরিশেষে, কোরবানি নিছক পশু জবাই নয়—এ এক আত্মার প্রশিক্ষণ, তাকওয়ার অনুশীলন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। একইসঙ্গে এটি সমাজে সহানুভূতি, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছড়িয়ে দেয়। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন ও বাস্তবায়নের তাওফিক দান করেন।আল্লাহুম্মা আমিন।


এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ